আসাতিযায়ে কিরামের খিদমাতে সবিনয় নিবেদন

শুরুতেই যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীনি খিদমাতে শরীক হয়ে নবিওয়ালা কাজের বিশেষ গুরুদায়িত্ব পালনে পথচলা শুরু করেছেন, বাল্লিগু আন্নী ওয়ালাউ আয়াহ’র সহযাত্রী হয়েছেন, তাফাক্কাহু ফিদ দীন’র কার্যাদি শেষ করে তার বাস্তব আমল করতে রওয়ানা দিয়েছেন সবাইকে আন্তরিক মুবারকবাদ ও শুভেচ্ছা। সাথে সাথে সকলের জন্য দুআ করছি, আল্লাহ যেনো সবার ইলমের মধ্যে বরকত দান করেন। আমানতদারী ও নিষ্ঠার সাথে খিদমাত করার তাওফিক দান করেন। আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। বিষয়টা আমাকে খুব পীড়া দিচ্ছে। না লিখে মনকে আটকে রাখতে পরছি না। পোস্টটি কষ্ট করে হলেও পড়ার চেষ্টা করবেন। মতামত দিবেন। অনুরোধ থাকলো।

প্রিয় পাঠক! আমরা দেখি, বিভিন্ন কওমি মাদরাসায় ভালো ছাত্রদেরকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হয়। তাদেরকে খোরাকিসহ হিউজ সুযোগসুবিধা দেওয়া হয়। এবং তাদেরকে সর্বোচ্চ টেককেয়ার করা হয়। পরীক্ষার উত্তরপত্রও দেখা হয় বিশেষ নজরে। অপরদিকে দুর্বল ছাত্ররা বরাবরই হিসেবের বাইরে থেকে যায়। দরদের ছিটেফোঁটা গায়ে মাখার সৌভাগ্য খুব কমই হয় তাদের। এদেরকে দেখা হয় ভিন্ন নজরে। অনেকে বিরক্ত হয়ে লাঠিচার্জ করেন বেধড়ক। মূল্যায়ন নেই তেমন; সুযোগসুবিধা তো দূর কী বাত। আর টেককেয়ার তো স্বপ্নই স্বপ্ন। আমার কাছে বিষয়টা অমানবিক মনে হয়। শেষতক দুর্বলরা দুর্বলই থেকে যায়। একটা সময় কিছুসংখ্যক হতাশ হয়ে ঝড়ে যায় অজান্তেই। তার আর ভালো হওয়ার স্বপ্ন থাকে না। একচোখা উস্তাযের বিষাক্ত থাবায় কখনো জীবনটাকে দুর্বিষহ মনে করে। আরো দেখি, কোনোমতে যদি ছাত্রটা ফিজিক্যালি আনফিট হয়, তাহলে তার কপালে আরো খারাপি থাকে। ফলে ভালো হওয়া, তার আর হয়ে ওঠে না। টেনেটুনে দাওরায়ে হাদিস পাস করে ফেললেও ইবারত পড়তে পারে না, অনুবাদও বোঝে না। শুধু নামধারীই হয়। আমার মতো নাকাম থেকে যায়। এমনটা হচ্ছে না যে, কেউ হলফ করে বলতে পারবেন না।

ইল্লা মাশাআল্লাহ এর ব্যতিক্রম হতে পারে। আমি বলছি না, সবাই একই মন মানসিকতার; অনেকেই আছেন যারা বিষয়টা গুরুত্বের সাথে দেখেন। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আকসর উস্তাযরাই দুর্বলদের এড়িয়ে চলেন। ‘তুই আর ভালো হবি না’, ‘তুর দ্বারা কিছু হবে না’। এমন রেওয়াজও আছে। বিষয়টাকে আমি দুর্ব্যবহারই বলবো। ভালো যে আছেন এর একটা মিসাল দিচ্ছি। ঢাকার একটি মাদরাসায় কিছুদিন পড়ার সুযোগ হয়েছিলো, তো সেখানের যে উস্তায ছিলেন তিনি নাহু-সরফে আলা দরজার মাহির ছিলেন; ভালো মুফাসসিরও। ছাত্রদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে। আল্লাহ তাঁকে দীনে ইলমের খিদমাত আরো বেশি বেশি করার তাওফিক দান করুন। তো তাঁকে দেখতাম, যারা পড়ায় একটু দুর্বল তাদেরকেও সমান গুরুত্বের সাথে দেখতেন। প্রয়োজনে আলাদা কামরায় নিয়েও পড়াতেন। অদম্য মেহনত চালিয়ে যেতেন। শেষ পর্যন্ত শিখিয়েই তবে ছাড়তেন। আমি বিষয়টা খেয়াল করতাম। মনে মনে আবেগে বলে ফেলতাম লোকটা গাধার মতো মেহনত করে যাচ্ছে! আসলেই এমন মেহনতি উস্তাযের বড়ই অভাব। যেটা বলতে চাইছি, খারাপের মাঝেও ভালো থাকে। খামখেয়ালির মাঝেও চোখের আড়ালে ভালোরা নিরবে ছাত্রদের তরে মেহনত ও মুজাহাদা করে যাচ্ছেন। নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিচ্ছেন তালিবুল ইলম’র জন্য। এমন নজিরও আছে; অস্বীকার করছি না।

কিন্তু যারা খামখেয়ালি করছেন, নিজেকে কামিং গোয়িং এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেছেন- এর দায়ভার কি তারা নিবেন? এ দোষ কার উপরে বর্তাবে? যাক সে দিকে যাচ্ছি না। আমি সমাধানের কথা বলছি, বলবো। আমরা এখন থেকে আগামী নিয়ে ভাববো। আহ! মনে পরে, মনে পরে খুব! বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক, আন্তর্জাতিক মুসলিম মনীষী, শাইখুল হাদিস উস্তায আল্লামা সুলতান যওক নদভি হাফিজাহুল্লাহ’র একটি বয়ানের কথা। চট্টগ্রামের জামেয়া দারুল মাআরিফ আলইসলামিয়া’র মসজিদে ছাত্রদের উদ্দেশে দেওয়া নসিহতে উস্তাযদের ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আপনারাও ছাত্রদেরকে দরদের সাথে পড়াবেন, শফকতের সাথে দারস দিবেন। ছাত্ররা আপনাদের কাছে আমানত। তাদের হক আদায় করে পড়াবেন। তারা আল্লাহর মেহমান’। কি মূল্যবান কথা! কতোইনা দরদমাখা কথা। যখনই ছাত্রদেরকে পড়াতে যাই, মনে পরে, মনে পরে। এই গুণ আর যোগ্যতা আমাদের ক’জনের মধ্যে আছে? আমরা কি পারছি হক আদায় করে পড়াতে?

আমরাতো আছি দায়সারা দারস আর মাস ফুরালেই বেতন ভাতা নিয়ে! কতটুকু হক আদায় করছি ছাত্রের জন্য? তাকে বুঝার চেষ্টা করেছি কখনো? কোথায় সমস্যা? ভেবেছি আদৌ? মেধা, মন আল্লাহ সবাইকে দিয়েছেন। কম আর বেশি এইতো ফারাক। কেউ একদিনে শেখে, কেউ দশদিনে শেখে। এইতো! কাউকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আল্লাহ নারাজ হবেন। ফেরেশতারা তিরস্কার করবেন। তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানে তার হক নষ্ট করা। সবাইকে সমান চোখে দেখার যোগ্যতা যদি আমার মাঝে না থাকে, কীসের উস্তায আমি? কীসের দীনের খিদমাত? সবই হিপোক্রিসি বা ভণ্ডামি।

আসুন, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাই। শুধু পণ্ডিতমার্কা দারস আর ইলমের জযবায়ী নয়; এর বাইরে যে আরো বিষয় আছে, সেগুলোর প্রতিও দৃষ্টি দিই। শিক্ষায় সমনীতির প্রয়োগ করি। একচোখা নীতি পরিহার করি। একজন আদর্শ শিক্ষকের পরিচয় বহন করি। বদলে দিই, বদলে যাই। আমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

[২৩ জুলাই ২০১৭ তারিখে লিখিত]

Back to top button