আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হযরত মুহাম্মাদ সা.

সামাজিক জীবনে একটি পরিবার পরিচালনার জন্য যেমন একজন প্রধান কর্তাব্যক্তি থাকে তেমনি একটি রাষ্ট্রের জন্য একজন রাষ্ট্রনায়ক থাকেন। যিনি রাষ্ট্রের দেখবাল করেন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে যুগযুগ ধরে চলে আসছে। প্রতিটি রাষ্ট্রেরই একজন রাষ্ট্রপতি থাকেন। যিনি রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে আনজাম দিয়ে যান। একজন রাষ্ট্রনায়ককে তখনই সফল রাষ্ট্রনায়ক বলা যাবে যখন তার মাঝে কোনো কমতি দেখা দিবে না। জনগণ বা রাষ্ট্রের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেকে দৃষ্টান্ত করেন।

রাষ্ট্রশাসকদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যেসব গুণাবলীর ভিত্তিতে কোনো শাসককে আদর্শ হিসেবে পরিগণিত করা হয়, সেই নিরিখে বিশ্বের কোনো কোনো শাসক কোনো কোনো দেশে হালকা কিবা আংশিকভাবে সফল হলেও তাদের কেউ’ই আদর্শ রাষ্ট্রশাসক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারেননি। যারা আদর্শ শাসকের কাতারেই আসতে পারেননি, তাদের কেউতো আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হবার প্রশ্নই অবান্তর।

এ ক্ষেত্রে পৃথিবীতে শুধু একজনই ব্যতিক্রম। তিনি আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আদর্শ রাষ্ট্রশাসকের সবগুলো গুণাবলী শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি একজন সফল শাসক এবং শাসকদের নায়ক। তাঁর রাষ্ট্রশাসনের সমালোচনার দুঃসাহস কিয়ামত তক কেউ করতে পারবে না। তিনি সফল না হয়ে পারেন না, কারণ তিনি ছিলেন আল্লাহর ওহি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সুরা আহযাবের ২১নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ َ “নিশ্চয়ই রাসুলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।” এটি তাঁর সার্বিক জীবন নিয়ে আল্লাহর সাক্ষ্য। আর রাষ্ট্রশাসন রাসুল সা. এর জীবনেরই একটি অধ্যায়। তবুও আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক নিজেই ঘোষণা করেছেন, “আমার যুগ, শ্রেষ্ঠ যুগ।” অতএব হযরত মুহাম্মদ সা. একজন সফল আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক এ কথা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়।

ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিক বিধান অথবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের নাম নয়। বরং একটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, যার মধ্যে মুসলমানদের সামগ্রিক জীবনবিধান, ধর্মীয়, সামাজিক, দেওয়ানী-ফৌজদারী, ব্যবসায় সংক্রান্ত, সামরিক বিচার বিভাগীয় এবং দণ্ডবিধিবিষয়ক আইন কানুন রয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি হলেন বিশ্বের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও সফল রাষ্ট্রনায়ক। যার ছিলো না কোন নিয়মিত সৈন্যবাহিনী, না ছিলো কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কর্মসূচি। অথচ তিনি এমন একটি আদর্শ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করলেন, যার নিদর্শন আজও ইতিহাসে বিরল। প্রখ্যাত বৃটিশ মনীষী বার্নার্ডশ বলেন If all the world was under one leader then Mohammad (sm) would have been the best fitted man to lead the peoples of various creed dogmas and ideas to peace and happiness.

অর্থাৎ পুরো বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের সম্প্রদায় আদর্শ ও মতবাদ সম্পন্ন মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এক নায়কের শাসনাধীনে আনা হতো তবে একমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই সর্বাপেক্ষা সুযোগ্য নেতারূপে তাদেরকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করতে পারতেন।

শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় যখন নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাস্তার ধারে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন, সে সময় তার কোটের পকেট থেকে তার নিত্যসময়ের সঙ্গী যে বইটি পাওয়া যায়, সেটি ছিল আবদুল্লাহ সোহরাওয়াদী লিখিত ‘দ্য সেয়িংস অব প্রফেট মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’। বাংলায় যার শিরোনাম ‘মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী’ বইটির একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, রাসুল সা. বলেছেন لا يؤمن أحدكم حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه ‘তুমি নিজের জন্য যেটা ভালো মনে করবে, অন্যের জন্যও তা ভাববে । আর যেটা নিজের জন্য মন্দ মনে করবে, অন্যের জন্যও তাই মনে করবে। (বুখারি ও মুসলিম)

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর আবদুর নূর ‘আযযিকর ওয়ালফালাহ গ্রন্থে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, ‘এক মার্কিন তরুণী দীর্ঘ দু‘বছর মেলামেশার পর, তার বাংলাদেশি পুরুষ বন্ধুকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। বন্ধুটি বলে যে, সে রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান। তাই তাকে বিয়ে করতে মেয়েটিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম হতে হবে। মার্কিন তরুণীটি ইসলাম ধর্ম কি, তা বুঝতে চাইলো। ছেলেটি তাকে আল্লামা আবদুল্লাহ ইউসুফ আলি কতৃক ইংরেজি অনুদিত পবিত্র কুরআন শরিফের একটি কপি দিয়ে বললো যে, এটি পড়লে ইসলাম সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে পারবে। দু‘মাস কুরআন অধ্যয়নের পর মার্কিন তরুণীটি এসে জানালো আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি ইসলাম গ্রহণ করবো। ইসলামের সৌন্দর্য ও সমন্বিত নীতিমালা আমাকে আর্কষণ করছে। এ ব্যাপারে আমার মা-বাবার আপত্তি নেই। কিন্তু তোমাকে আর বিয়ে করতে পারব না। কারণ তোমার আচার আচরণ লক্ষ্য করছি সম্পূর্ণ কুরআন পরিপন্থী। রুশ দেশীয় লিও টলস্টয় ও মার্কিন তরুণী যা বুঝতে ও অনুধান করতে পারছে, মুসলমানরা সেটা কতটুকু হৃদয়ঙ্গম করতে পারছে?

আজকে আমাদের সমাজের পুরো কনসেপ্টাই বদলে গেছে। ইসলামের সুমহান আদর্শ ভুলে ভাণ্ডামি সকল চিন্তা-চেতনার আদর্শ লালন করছে। যে ধর্ম মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব শেখায়, যে ধর্ম সকল কুসংস্কারকে বাতিল ঘোষণা করে, যে ধর্ম মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে শেখায় সে ধর্মকে সনাক্ত করতে পারছে না। মনগড়া মতবাদ আর বিশ্বাসের উপর নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে। অথচ মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. যে কনসেপ্ট দিয়েছেন উম্মাহকে সে চিন্তা বা আদর্শের মধ্যেই যে মুক্তি রয়েছে তা কারোরই যেনো বোধগম্য হচ্ছে না।

পৃথিবীতে কোনো মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রশক্তি অপরিহার্য। পৃথিবীর স্রষ্টা আল্লাহ রাসুল সা. কে আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অন্যান্য সকল মতাদর্শের উপর দীন ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য প্রেরণ করেছেন। কুরআনুল কারিমে সুরা সফের ৯ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, “তিনি আল্লাহ! তার রাসুলকে হিদায়াত ও সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন যেনো, অন্যান্য সকল দীনের উপর তাকে বিজয়ী করতে পারেন।” সুরা বনী ইসরাঈলের ৮০নম্বর আয়াতে আল্লাহ তার রাসুলকে রাষ্ট্রশক্তি অর্জনের নসিহত দিয়েছেন। তাই আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক জন্মভূমির কাফেরদের অত্যাচারে আল্লাহর নির্দেশে প্রাচীন ইয়াসরিব নগরে হিজরত করেন। ইয়াসরিবকে “মদিনা” নামে তিনি আদর্শ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। ৬২২-৬৩২ ঈসায়ি সাল পর্যন্ত আমৃত্যু ১০ বছর মদিনাকে কেন্দ্র করে জাজিরাতুল আরবে শাসন কার্য পরিচালনা করেন। তার এই ১০ বছরের সুশাসনই তাঁকে ইতিহাসে আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত অনুসরণীয় করে তুুলেছে।

রাসুল সা. এর রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে যে ক’টি কর্মসূচি পাওয়া যায় তা হলো, সুরা হজ্জের ৪১ নম্বর আয়াত থেকে নামায প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান, অসৎ কাজের নিষেধ প্রদান। সুরা বনি ইসরাঈলের ২৩-৩৭ আয়াত থেকে- শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করা, নিকটাত্মীয়, মিসকিন ও সম্বলহীন পথিকদের অধিকার প্রদান, অপচয়-অপব্যয় না করা, নিকটাত্মীয়, মিসকিন ও সম্বলহীন পথিকদের বিনয়সূচক জবাব দেয়া, খরচের বেলায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা, দারিদ্রের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা, জিনার নিকটবর্তী না হওয়া, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া কোনো মানুষ হত্যা না করা, এতিমের সম্পত্তি আত্মসাৎ না করা, ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, সঠিকপন্থায় ওজন করা, যে বিষয়ে মানুষের জ্ঞান নেই, তার পেছনে না ছুটা, জমিনে অহংকারীভাবে না চলা। অতএব আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের মূল উৎস ছিলো আলকুরআন। তা থেকে সংগৃহীত উপরোক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তিনি রাষ্ট্রশাসনে সফলতা অর্জন করেছিলেন।

রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পর মুহাম্মদ সা. এর জীবন থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো:
এখনকার শাসকরা জনগণের মতভেদকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জনগণের মধ্যে হিংসা, বিভেদ ও অনৈক্য প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অপরদিকে আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ সা. মদিনা রাষ্ট্র গঠন করেই জনগণের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। যা ছিলো সুশাসনের জন্য অতীব জরুরি। মদিনার সমাজ ছিল বহুদা বিভক্ত। আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা বংশ পরস্পরায় বিভেদের বীজ বপন করেছিলো। আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ সা. তাদেরসহ পুরো মদিনার জনগণকে পরস্পরের শত্রু থেকে কল্যাণকামী বন্ধুতে পরিণত করে দিলেন।

বেকারত্ব দূরীকরণে জনগণের কর্মসংস্থানে যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গঠন করে হুযুর সা. যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। তার প্রেরণায় মদিনার মানুষ কৃষি ও ব্যবসায় প্রচুর উন্নতি সাধন করে। তিনিহীন ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ করেন। ঘোষণা করেন اليد العليا خير من اليد السفلى “নিশ্চয় নিচের হাত থেকে উপরের হাত শ্রেষ্ঠ।” অর্থাৎ গ্রহীতা থেকে দাতা উত্তম। এক ব্যক্তিকে তার শেষ সম্বল একখানা কম্বল বিক্রি করিয়ে তার হাতে কুঠার তুলে দিয়ে কর্ম যুদ্ধে অবতীর্ণ করান। এভাবে জনগণকে তিনি কর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করে অনুসরণীয় আদর্শ সৃষ্টি করেছেন।

পবিত্র কুরআনের প্রথম ওহি “ইকরা”। তাই আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হযরত মুহাম্মদ সা. তাঁর জনগণকে শিক্ষিত করতে সর্বদা তৎপর ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। তিনি মসজিদে নববিকে একটি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। যুদ্ধবন্দীদের শিক্ষা দানের বিনিময়ে মুক্ত করে দেবার নজির শুধু তিনিই স্থাপন করেছিলেন। বদরের যুদ্ধে বন্দী শিক্ষিত মুশরিকদের অশিক্ষিত মুসলিমকে শিক্ষা দিয়ে মুক্ত হতে তিনি সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

যুদ্ধ নয়; সন্ধি চাই। মানুষ একটু ক্ষমতাবান হলেই আগ্রাসী হয়ে ওঠে। বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতাবানরা এর বাস্তব নজির। অথচ আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হযরত মুহাম্মদ সা. বিশাল ক্ষমতাবান হওয়া সত্ত্বেও সর্বদা যুদ্ধ এড়িয়ে তিনি সন্ধি স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। জীবনে তিনি বহু সন্ধি ও চুক্তি স্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে হুদাইবিয়ার সন্ধি ও ঐতিহাসিক মদিনা সনদ শান্তি স্থাপনে তাকে আদর্শ রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে।

রাসুল সা. কখনো যুদ্ধ চাননি। কিন্তু, যুদ্ধবাজ শয়তানরা বারবার তাঁর উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে ছিলো। তিনি আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করেছেন। তাই তাঁর জীবনে বদর, উহুদ, খন্দক, হুনায়ুন প্রভৃতি যুদ্ধ এসেছে। তিনি ছিলেন সর্বক্ষেত্রে আদর্শ। তাই যেমন মসজিদে ইমামতি করেছেন, তেমনি যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথমে হামলা না করা, নারী-শিশু ও অক্ষমদের হত্যা না করা, গবাদী পশু, ফলবতী গাছ-পালা না কাটা এবং যুদ্ধ বন্দীদের সাথে সুআচরণে একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তিনি উদাহরণ।

সংখ্যালঘুদের প্রতি হুযুর সা. এর আচরণ অনুসরণীয়। ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মাধ্যমে তিনি তাদেরকে যে অধিকার দিয়েছিলেন, তা আজকের দিনে রূপকথার গল্প। এক ইহুদি মসজিদে নববিতে পেশাব করা শুরু করলো। সাহাবারা তাকে মারতে উদ্যত হলে, বিশ্বনবী বাঁধা দিলেন। কাজ সেরে ফেলার পর নবী সা. তাকে বললেন, “তোমার দীনের পবিত্র স্থানে কেউ এমন করলে কি করবে?” লোকটি লজ্জিত হলো। রাসুল সা. তাকে ক্ষমা করলেন। তাই সে আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের আচরণে মুগ্ধ হয়ে ইসলামে দাখিল হলো। তিনিই সাহাবিদের আদেশ করেন, “তোমরা মুশরিকদের প্রভূকে গালি দিও না। তাহলে তারা না বুঝে আল্লাহকে গালি দেবে।”

বিশ্বের শাসকরা যেখানে জনগণের সম্পদ কুক্ষিগত করে সম্পদের পাহাড় গড়ছে, সমুদ্রের বিশালতার হৃদয় দিয়ে আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক সেখানে সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছেন। হুনায়ুনের যুদ্ধের পর তিনি যা দান করেছিলেন, ইতিহাসে তা বিরল। জুবায়ের ইবনে মুত’য়েম রা. থেকে বর্ণিত, হুনায়ুন থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় কিছু গ্রাম্য লোক রাসুলকে সা. জড়িয়ে ধরলো এবং সাহায্যের আবদার করলো। এমনকি তারা তাঁকে একটি বাবলা গাছের নিচে নিয়ে তাঁর চাদরটি খুলে নিলো। নবি সা. সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমার চাদর খানা ফিরিয়ে দাও। যদি আমার কাছে এই কাটা বৃক্ষগুলোর সমান সংখ্যক বকরি বা উট থাকতো তাহলে সবই তোমাদের মধ্যে বিলিয়ে দিতাম। কেননা, আমি কৃপন স্বভাব, মিথ্যাচারী বা ভীরু কাপুরুষ নই।” (বুখারি)

মুহাম্মদ সা. সর্ববিষয়ে একক সিদ্ধান্ত প্রদানের অধিকারী ছিলেন। তথাপি তিনি পরমতসহিষ্ণু ছিলেন। বিভিন্ন পর্যায়ে, তিনি সাথীদের পরামর্শ গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যেমন- হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সাহাবিদের আবেগ প্রশমিত করতে তিনি উম্মে সালমার রা. পরামর্শে মাথা মুন্ডন করেন। খন্দক যুদ্ধে সালমান ফারসির রা. পরামর্শে পরিখা খনন করেন। বদর যুদ্ধের ময়দানেও তিনি সাহাবি হুবাব ইবনে মুনযির রা. এর পরামর্শ পছন্দ করেন।

মুহাম্মদ সা. এর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে সত্যের দুশমনরা জনগণের মনে জুজুর ভয় সৃষ্টি করতে পেরেছিলো। মক্কা বিজয়ের দিন মিথ্যা ভয়ে লোকজন পালাচ্ছিলো। মহানুভব আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক দেখলেন, এক বৃদ্ধা অতিকষ্টে তার লটবহর নিয়ে চলছে। তিনি বৃদ্ধার লটবহর নিজে বহন করে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। বৃদ্ধা জানালো সে মুহাম্মদের ভয়ে মক্কা ছেড়ে পালাচ্ছে। পরে বললো! কে বাবা তুমি এত ভাল লোক? রাসুল সা. বললেন, যার ভয়ে তুমি পালাচ্ছ, আমি সেই আবদুল্লাহ’র পুত্র মুহাম্মদ। বৃদ্ধার জুজুর ভয় কেটে গেলো। সে আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের মহানুভবতায় ইসলামে দাখিল হলো।

কুরাইশরা আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ সা.কে এতো অত্যাচার করলো। এমন কি নিজের জন্ম মাটি থেকে উৎখাত করলো। অথচ মক্কা বিজয়ের দিন তাদের উপর কোনো প্রতিশোধ নিলেন না। ক্ষমা করে দিলেন। বললেন, “আজ তোমাদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত”। বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ধ জয়ী কোনো আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের এমন উদাহরণ শুধু মুহাম্মদ সা.-ই সৃষ্টি করেছেন।

চৌদ্দ’শ বছর পূর্বে আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মুহাম্মদ সা. বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্রশাসকদের জন্য যে আদর্শ স্থাপন করেছিলেন আজকের বিশ্ব তীব্রভাবে তার অভাব অনুভব করছে। আজ পৃথিবীর দেশে দেশে ভণ্ড শাসকদের শোষণে পৃথিবীর মজলুম মানুষ একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের জন্য আর্তনাদ করছে। শত আর্তনাদেও আর্দশ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ সা. আসবেন না বটে। কিন্তু, তাঁকে অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন করে বিশ্বের নির্যাতিত মানুষকে জুলুমের অন্ধকার কুন্ডলী থেকে উদ্ধার করতে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে। এই কামনা যতো শিগগিরই বাস্তবায়িত হবে, তত শিগগিরই বিশ্ব মানবতার কল্যাণ সাধিত হবে। দার্শনিক মাইকেল হার্ট যথার্থই বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি অশান্তির বিশ্বে শান্তি আনতে হলে সমগ্র বিশ্বের একক ক্ষমতা আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ সা. এর হাতে অপর্ন করলেই তা শুধু সম্ভব।” অতএব তামাম বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের জন্য মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. এর রাষ্ট্রচিন্তাকে বাস্তব জীবনে প্রতিফলন ঘটালে তবেই পৃথিবীতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও আদর্শ রাষ্ট্র বিনির্মাণ হবে।

লেখাটি জামেয়া রেঙ্গার দস্তারবন্দি স্মারকে প্রকাশিত [ডিসেম্বর ২০১৯]

Back to top button