Browse Category by ধর্ম
ধর্ম, সমাজচিন্তা

আলকুরআনে সামাজিকতার সবক – ১

আলকুরআনে সামাজিকতা

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের সাথে মিশেই গড়ে নিতে হয় জীবন। নিজেকে পরিচালনা করতে হয় আদব-আখলাকে, কথাবার্তায়, চলাফেরায় সামাজিকতার আদর্শ রূপে। যে আদর্শে থাকবে নৈতিকতা, উত্তম চরিত্রের বাস্তব প্রকাশ, সে আদর্শকেই লালন করে জীবনকে করতে হয় সুন্দর। যোগ্যতা আর সামাজিকতা এক নয়; দু’টি বিষয়। কেউ জ্ঞানী বা যোগ্য হলেই সামাজিক হয়ে ওঠে না। তাকে সমাজিকতার সবক নিয়ে চলতে হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে ‘ইসলাম ধর্ম’র চেয়ে সর্বাধুনিক ও সামাজিক কোনো ধর্ম হতে পারে না। কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরামের আদর্শ থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায় সুস্পষ্ট। আজ যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো সেটা হচ্ছে ‘মুকতাযায়ে হাল’ বা স্থান-কাল-পাত্রের ভেদজ্ঞান। সোজা কথায় কার সামনে কীভাবে কথা বলতে হয় সে বিষয়ে। তো চলুন মূল কথায় যাই। মহাগ্রন্থ আলকুরআনের সুরা হুজরাতে উল্লেখ আছে ‘হে মু’মিনগণ! নিজেদের আওয়াজ রাসুলের আওয়াজের চেয়ে উঁচু করো না এবং উচ্চস্বরে নবীর সাথে কথা বলো না, যেমন তোমরা নিজেরা পরস্পর বলে থাকো। এমন যেন না হয় যে, তোমাদের অজান্তেই তোমাদের সব কাজ-কর্ম ধ্বংস হয়ে যায়।’

যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে ওঠাবসা ও যাতায়াত করতেন তাদেরকে এ আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো। এর উদ্দেশ্য ছিল নবির সাথে দেখাÑসাক্ষাৎ ও কথাবার্তার সময় যেনো ঈমানদাররা তাঁর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি লক্ষ রাখেন। কারো কণ্ঠ যেনো তাঁর কণ্ঠ থেকে উঁচু না হয়। তাঁকে সম্বোধন করতে গিয়ে কেউ যেনো একথা ভুলে না যায় যে, সে কোনো সাধারণ মানুষ বা সমকক্ষ কাউকে নয়, বরং আল্লাহর রাসুলকে সম্বোধন করে কথা বলছে। সে যেন সচেতন থাকে সাধারণ মানুষের সাথে তার কথাবার্তা এবং আল্লাহর রসুলের সাথে কথাবার্তার মধ্যে পার্থক্য থাকে। সে যেন তাঁর সাথে উচ্চস্বরে কথাবার্তা না বলে।

যদিও এ আদব কায়দাগুলো শেখানো হয়েছিল নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসের জন্য এবং সম্বোধন করা হয়েছিলো নবীর যুগের লোকদেরকে। কিন্তু যখনই নবির আলোচনা হবে কিংবা তাঁর কোনো নির্দেশ শুনানো হবে অথবা তাঁর হাদিসসমূহ বর্ণনা করা হবে এরূপ সকল ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ের লোকদেরও এ আদব-কায়দাই অনুসরণ করতে হবে। তাছাড়া নিজের চেয়ে উচ্চ মর্যাদার লোকদের সাথে কথাবার্তা ও আলাপ-আলোচনার সময় কী কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে এ আয়াত থেকে সে ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। কেউ তার বন্ধুদের সাথে কিংবা সাধারণ মানুষের সাথে যেভাবে কথাবার্তা বলে, তার কাছে সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের সাথেও যদি একইভাবে কথাবার্তা বলে তাহলে তা প্রমাণ করে যে, সে শিষ্টাচার শিখে নাই। অন্য কথায় ব্যক্তির প্রতি তার মনে কোন সম্মানবোধ নেই। সে তার নিজের ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য করার যোগ্যতা রাখে না।

আমার যতদূর মনে হয়, আমরা পূর্ণ সামাজিক হয়ে ওঠতে পারিনি। আমাদের আচরণে ঘাটতি রয়েছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আমার চেয়ে সম্মানী, মুরব্বি বা বয়সে বড়দের সাথে তারতম্য বজায় রেখে কথা বলা। আদব রক্ষা করে পরিবেশ বুঝে নিজেকে জাহির করা। হতে পারে সেটা সরলতা থেকেও। কিন্তু অন্যজন উল্টো বুঝতে পারে। বেয়াড়া ধরে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা উচিত। বড়দের সামনে নিরবতাই উত্তম আদর্শ। পরিবেশ সেরকম হলে বা সুযোগ হলে অসুবিধে নেই। কিন্তু তার আগেই জোরেশোরে কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। বেয়াদবি বা অশিষ্ট আচরণ যেনো না হয়। আল্লাহ আমাদের সঠিক আমল করার তাওফিক দান করুন।

[৫/৪/২০১৯ তারিখে সিলেটের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক সিলেটের ডাকে প্রকাশিত]

ধর্ম, সরকার

মূত্রবিসর্জন ও ধর্মমন্ত্রণালয়ের ভণ্ডামি

যেখানে সেখানে মূত্রবিসর্জন ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্ন দেয়ালে আরবি ভাষা ব্যবহারের অভিনব কৌশল বেছে নিয়েছে ধর্মমন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশন। ক’দিন ধরে শুরু হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন দেয়ালে আরবি ভাষায় দেয়াল লিখন। প্রকাশ পাচ্ছে ‘যেখানে সেখানে প্রস্রাব না করার’ বার্তা।

ভাবছিলাম এ বিষয়ে কিছু একটা লিখবো। ব্যস্ততার কারণে ইচ্ছেটা ঘুরে যায়। কিন্তু না লিখে পারছি না। একটু দেরিতে হলেও লিখতে হলো। আমাদের দেশের সাংসদ-মন্ত্রীরা যা শুরু করছেনে তাতে আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশের হাল-হকীকত কতটুকু চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছিলো। আমরা লক্ষ্য করেছি, কিছুটা কাজও হয়েছে। এবং সাথে সাথে লক্ষ্য করলাম সরকারের মন্ত্রীদের অদূরদর্শী কর্মকাণ্ডও। দেখলাম তাদের মেধাশূণ্যতার হালচাল।

বাংলাদেশের ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের একটি ভিডিও ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাচ্ছে। এতে তিনি বলছেন, ‘দেখা যাচ্ছে ঢাকা শহরের মসজিদগুলোতে প্রস্রাবের জায়গা থাকলেও অনেকে বাইরে প্রস্রাব করছে। ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না’ লেখা দেয়ালেও লোকে প্রস্রাব করছে’।

আমরা বরাবরই এমন কিছু আত্মঘাতি কাজ করি যেগুলো হয় ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক, হয় ধর্মের প্রতি চরম ধৃষ্টতা। ধর্মমন্ত্রণালয় যত্রতত্র প্রস্রাব বন্ধে যে উদ্যোগটি নিয়েছে সেটি কোনো বিবেকবান, রুচিশীল ও ধর্মপ্রাণ মানুষ মেনে নিতে পারে না। বিশেষ করে ৯০ভাগ মুসলমানের দেশে এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ভিডিওটিতে বলা হয়েছে, ‘৯০ ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশে আরবি একটি পবিত্র ভাষায় হিসেবে বিবেচিত, যদিও খুব কম লোকই এ ভাষা জানেন বা বুঝেন। তাই প্রকাশ্যে প্রস্রাব না করার বার্তাটি রাস্তার পাশের দেয়ালগুলোতে আরবি ভাষাতে লিখে দিচ্ছেন’।

ভাবতে আবাক লাগে, আমাদের চিন্তা-চেতনা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! প্রস্রাব বন্ধে কি আর কোনো পথ ছিলো না? আর কোনো কৌশল পাওয়া গেলো না? একটি ভাষার অপব্যবহার করতে হবে কেনো? আমরা এতোটা খারাপ কেনো? বিশ্বের কাছে কি আদৌ আমরা ভালো কিছু জানান দিতে পারবো? নাকি বস্তাপচা আইডিয়ার প্রসবই করে যাবো?

মানবজাতির সর্বপ্রকার সমস্যা সমাধানের একমাত্র ঠিকানা ঐশিগ্রন্থ ‘আলকুরআন’। আমরা জানি এ মহাগ্রন্থটি আরবি ভাষায়। অবর্তীণ হয়েছে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ সা. এর উপর। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই আরবি ভাষার প্রতি মানুষের দুর্বলতা থাকবে। আরবি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবে। কিন্তু এ বিষয়টিকে পুঁজি করে আরেকটি ফায়দা হাসিলের কাজ কেনো করতে হবে?

সরকারের পক্ষ থেকে যথাস্থানে পাবলিক টয়লেট বানিয়ে দিলেই তো হয়ে যায়। এটা তো জটিল কিছু না! তখন আর কেউ যেখানে সেখানে প্রস্রাব করবে না। এর জন্য একটি ভাষাকে পুঁজি বানিয়ে ভণ্ডামো করার তো কোন প্রয়োজন দেখছি না?

‘কোথাও কোথাও আবার দিকনির্দেশক চিহ্নসহ আরবির পাশাপাশি বাংলাতেও লেখা হচ্ছে : ‘১০০ হাত দূরে মসজিদ’ অর্থাৎ বলে দেয়া হচ্ছে যে সেখানে গেলে প্রস্রাবের জায়গা পাওয়া যাবে’।

ধর্মমন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন, মসজিদগুলোকে কি আপনার বাপের টাকায় বানানো? মসজিদকে পাবলিক টয়লেট বানাতে চান? মসজিদ কি প্রস্রাব-পায়খানা করার জাগা? এতো ফাউল চিন্তা আপনার মাথায় কীভাবে আসলো? মসজিদ হলো এবাদতখানা। এখানে মুসল্লীরা তাদের প্রয়োজনমতো হাজত পুরা করবে।

এতে আরো বলা হয়, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই অভিনব উদ্যোগ ইতিমধ্যেই দারুণ কার্যকর হয়েছে’। এটাও একটা ভুল কথা। এ কার্যকর স্থায়ী না। কারণ মিডিয়ায় প্রকাশ করে দিয়েছেন আপনাদের ভেলকিবাজী। কিছুদিন পর যখন সবাই যেনে যাবে আসলে এটা ছিলো একটি কৌশলমাত্র। আরবিতে প্রস্রাব না করার কথাই লিখা ছিলো। তখন দেখা যাবে, আরবির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে গেছে। ভীতির অনুভূতি লুপ্ত হয়ে যাবে। কোথাও আরবি লেখা দেখলে সম্মান করবে না। এমনকি যারা আরবি বুঝে না তারা যখন কোথায় কুরআনের আয়াত পড়ে থাকতে দেখবে তখন কিছু মনে করবে না। একটা সময় কুরানের আয়াতের উপর দিয়ে হাটলেও বুঝবে না যে, এটা ছিলো কুরআনের আয়াত! এর দায়ভার কে নিবে? আসলে আপনাদের এ ভাবনাটি সম্পূর্ণ উদ্ভট এবং বিকৃত মস্তিষ্কের কাণ্ডজ্ঞানহীন অসত চিন্তাধারা।

সবশেষে বলবো, দেশের জন্য ভালো কিছু করুন। এ দেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের। একটু বুঝে-শুনে চিন্তা-ফিকির করুন। মাথায় যাই আসলো তাই করে ফেলবেন! এটা কিন্তু ঠিক না, লোকে পাগল বলে। আর মন্ত্রণালয়ের যদি কোনো কাজ থাকে না তাহলে মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিন। মানুষের কাতারে আসেন। মানুষ হন।